রংপুরের ৬শত অতিদরিদ্র পরিবার ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প

রংপুরের পীরগাছায় আর্ন্তজাতিক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইসলামিক রিলিফের সহায়তায় উপজেলার কৈকুরী ইউনিয়নের ৬ শত পরিবার স্বাবলম্বী হয়েছে।

অতিদরিদ্র পরিবারকে আয়বর্ধনমূলক কর্মসূচির মাধ্যমে তাদের পারিবারিক অসচ্ছলতা দুরীকরণ, অর্থনৈতিক ও আত্মসামাজিক উন্নয়ন আয়বর্ধনমূলক কর্মসৃষ্টি, শিশুদের শিক্ষা ও অধিকার, নারীর ক্ষমতায়ন ও মর্যাদা উন্নীতকরণ এবং সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের সেবা গ্রহণের সুযোগ করে দিয়েছে সংস্থাটি।

গত ১৬ নভেম্বর ২০২১ তারিখে নজর মামুদ মহিলা স্বাবলম্বী দল পরিদর্শন কালে দেখা যায়, ২০-২৫ জনের একটি দল সভা করছে। যেখানে বাল্যবিবাহ, যৌতুকের কুফল, নারী নির্যাতন, নারীর অধিকার, স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা ব্যবহার, নিরাপদ পানি, শিশুদেও পড়াশোন প্রভৃতি বিষয়ে আলোচনা করছে।

এই দলের সভাপতি মনোয়ারার বেগম (৩৫) জানান, এলাকায় বাল্যবিবাহের হার কমেছে, স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা ব্যবহারের ফলে এলাকায় রোগব্যাধি কমেছে,নারীরা সচেতন হয়েছে ও নারী নির্যাতন কমেছে। তিনি আরো জানান, আগে মানুষ আমাদেও মর্যাদা দিত না, এখন আমরা সচেতন হয়েছি। একসময় আমরা দুবেলা ভাত খেতে পারতাম না, এখন আমরা আর আগের অবস্থানে নেই।

তিনি জানান,স্বাবলম্বী দলের এই সভায় প্রতিটি সভায় মুষ্টি চাল সংগ্রহ করা হয় কারণ যাতে সমাজের বিত্তবানদেও কাছ থেকে চাল ধার নিতে গিয়ে লজ্জায় পড়তে হয় না। নিজেদেও প্রয়োজনে এই জমাকৃত চাল থেকে পরিবারের কাজে লাগানো সম্ভব হয়।
শ্রীমতি মালতি রাণী (৩০) জানান, কৈকুরী ইউনিয়নের সুবিদ রায় পাড়াগ্রামে বাস করেন। স্বামী ধীরেন্দ্র নাথ চন্দ্র রায় মৌসুমী জেলে। সামান্য আয় দিয়ে ২ ছেলেকে নিয়ে অভাবের সংসার চলছিল কোনোমতে। একপর্যায়ে একমাত্র উপার্জনকারী স্বামীর মৃত্যুতে মালতী রানী দিশেহারা হয়ে পড়েন। পার্শ¦বর্তী ধানের চাতালে কাজ করে সংসারের হাল ধরার চেষ্টা করেন। কিন্তু হিমসিম খাচ্ছিলেন। অভাবের এই সময়ে ইসলামিক রিলিফ বাংলদেশ এর স্বনির্ভর দলের সদস্য হন। এককালীন ১০ হাজার টাকা নিয়ে চাতালের কাজের পাশাপাশি ছোট দোকান দেন। এখন সচ্ছলতার সাথে জীবন যাপন করছেন। সন্তানও পড়াশোনা নিয়মিত চালিয়ে যাচ্ছেন।

রংপুর জেলার পীরগাছা উপজেলার একটি প্রত্যন্ত এলাকা নজর মামুদ। দরিদ্র কৃষক আবদুস সামাদ মেয়ে নাসিমাকে ১৪ বছর মেয়ের বিয়ে দেন। কিন্তু অল্প বয়সে মা হওয়ার কারণে তার শরীর-স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়ে এবং দিনদিন তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। নাসিমা ঠিকমত সংসারের কাজ কর্ম করতে পারেতেন না, ফলে সংসারে সবসময় অশান্তি লেগেই থাকত। এই সময় ইসলামিক রিলিফ বাংলাদেশ দরিদ্র মানুষের টেকসই উন্নয়ন ও নারীদের ক্ষমতায়নের লক্ষে ইইপি প্রকল্প নামে একটি কার্যক্রম শুরু করে। নাসিমা বেগম সংস্থার নির্বাচিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন।

ইসলামিক রিলিফ বাংলাদেশ নজরমামুদ গ্রামে অতিদরিদ্র মহিলাদের নিয়ে একটি স্বাবলম্বন দল গঠন করে এবং নাসিমা বেগম দলের সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হন। তিনি ইসলামিক রিলিফ বাংলাদেশ থেকে নেতৃত্ব উন্নয়ন, আয়বৃদ্ধিমূলক কাজ ও অন্যান্য সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ গ্রহন করেন। সংস্থার বিভিন্ন সচেতনতামূলক যেমন বাল্যবিবাহ, নারী অধিকার, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সভার মাধ্যমে সচেতন হন। তিনি বলেন, “আমার স্বপ্ন সমাজে কোন বাল্যবিবাহ থাকবেনা, প্রতিটি নারী হবে ক্ষমতায়িত। আমি চাই আমার মত আর কোন মেয়ে অপুষ্টিতে না ভোগে। প্রতিটি নারী স্বাধীনভাবে সম্মান ও মর্যাদার সাথে জীবনযাপন করবে।” সংস্থা থেকে এককালীন টাকা পেয়ে আয়বৃদ্ধিমূলক কাজে বিনিয়োগ করেছেন। এখন তার বাড়িতে ২টি গরু, ২টি ছাগল, ৫টি হাঁস ও ১ টি মুরগী রয়েছে। এখন তিনি স্বাবলম্বী।

সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, কৈকুরী ইউনয়নের নজরমামুদ গ্রামের সাহিদা বেগম (৩৮) জানান, প্রতিবন্ধী স্বামী হুইল চেয়ার ছাড়া চলতে পারেন না। ২ ছেলে ও ১ মেয়ে নিয়ে অভাবের সংসার। সেলাইয়ের কাজ করে পরিবারের ভরণপোষণের চেষ্টা করতেন। তারপরও অভাব যেন নিত্যসঙ্গী। একপর্যায়ে ইসলামিক রিলিফের প্রকল্পের সাথে সম্পৃক্ত হই। তিনি আরো বলেন, সংস্থাটি থেকে এককালীন ১০ হাজার টাকা নিয়ে দর্জির কাজের পাশাপাশি নিজ বাড়িতে একটি মুদি দোকান দেই। ব্যবসায় আয় বাড়তে থাকে। এরপর একটি গাভী ক্রয় করে এবং দুধ বিক্রি করে বেশ লাভবান সংসারের কাজে লাগাই। এখন সংসারের অভাব দুর হয়েছে। সন্তানদের পড়াশোনাও ঠিকমত করাতে পারছি।

সংস্থার পীরগাছা উপজেলায় দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকল্প কর্মকর্তা মনজুরুল ইসলাম জানান, পরিবারের সচ্ছলতা আনয়নে এককালীন ১০ হাজার টাকা নগদ অর্থ প্রদান করেছে। যাতে যেকোন আয় বৃদ্ধিমূলক কাজে সম্পৃক্ত হতে পারে। এসব অর্থ সঠিকভাবে কাজে লাগাতে গাভী পালন, গরু মোটা তাজাকরণ, ছাগল পালন, ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রভৃতি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। এছাড়াও দরিদ্র এসব পরিবারের পুষ্টির চাহিদা পূরণে সবজি বীজ ও ফলজ গাছের চারা বিতরন করা হয়েছে।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. সামছুজ্জোহা বলেন, নারীর ক্ষমতায়ন ও নিজেদের স্বাবলম্বী করতে ইসলামিক রিলিফের এই ধরণের কার্যক্রম সত্যিই প্রশংসনীয়। সংস্থাটি প্রাণিসম্পদ বিভাগের সহযোগিতায় বিধবা নারীদের বিভিন্ন আয়বর্ধনমূলক প্রশিক্ষণ প্রদান করে, যা গ্রামীন অসহায় দরিদ্র মানুষগুলোর জন্য খুবই কার্যকরী পদক্ষেপ। এই কার্যক্রমকে আরো স¤প্রসারণ করা দরকার।


পীরগাছা উপজেলা চেয়ারম্যান আবু নাছের মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, সমাজের দারিদ্রতা দূরীকরণে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থার ভুমিকা অনেক। আমার এলাকার কৈকুরী ইউনিয়নে ইসলামিক রিলিফ বাংলাদেশ অসহায় ৬ শত পরিবারকে একই প্লাটফর্মে এনে পরিবারের সচ্চলতা আণয়নে যে সমন্বিত কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে তা সত্যিই ব্যতিক্রম। পরিবারগুলোর দু:খ দুর্দশা কাটিয়ে টেকসই পরিবর্তনে ইসলামিক রিলিফের দারিদ্র দূরীকরণ মডেল একটি দৃষ্টান্ত।

সংস্থার এডভোকেসি ও কমিউনিকেন্স কো-অর্ডিনেটর সফিউল আযম বলেন, যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ইসলামিক রিলিফ বাংলাদেশে ১৯৯১ সাল থেকে কাজ করছে।

প্রান্তিক দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও মর্যাদা বৃদ্ধিকল্পে আমরা কাজ করছি। আমরা চাই সমাজের অবহেলিত ও দরিদ্র পরিবারগুলো যেন স্বাবলম্বী হয় এবং মতামত প্রদান ও নেতৃত্ব বিকাশের মাধ্যমে পরিবার ও সমাজ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভ’মিকা রাখতে পারে। সে লক্ষ্যে মাথায় রেখেই আমাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও সুশাসন কার্যক্রমগুলো বাস্তবায়িত হয়।

সরেজমিন দেখা যায়, এই প্রকল্প থেকে বাল্যবিবাহ, যৌতুক প্রতিরোধ, নারী নির্যাতন, শিশুশ্রম প্রতিরোধ, কেভিড-১৯, স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা ব্যবহার, নিরাপদ পানি ও অন্যান্য সচেতনতামূলক বিষয়ে কমিউনিটি পর্যায়ে নিয়মিত কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। কোভিড-১৯ বিষয়ে সচেতনার জন্য ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা পরিষদে বিলবোর্ড ও হাত ধোয়ার করার জন্য বেশকিছু ওয়াশ পয়েন্ট তৈরী করা হয়েছে। এই ইউনিয়নের এসব নারীরা এখন সচেতন এবং স্বাবলম্বী।

ভিডিও-

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *