আপা’ নৌকা বাইছ ‘দেখবেন নাকি?

আপা’ নৌকা বাইছ ‘দেখবেন নাকি?

0
SHARE

লেখক: ইসমত আরা:

কোন জাতির সামগ্রিক পরিচয় তার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে ফুটে উঠে। সংস্কৃতি হলো একটি জাতির সামাজিক ভাবধারার প্রতিচ্ছবি। সভ্যতার অরুণোদয়ের সাথে সাথে মানব সংস্কৃতি তার গতিপথ খুঁজে পেয়েছে। যুগে যুগে তার পরিবর্তনও ঘটেছে ব্যাপক।
তাই তো বাংলার প্রাচীন সংস্কৃতিগুলো আজ বিলুপ্তির পথে প্রায়। বাংলার মানুষ আজ আনন্দের সাথে গলা ছেড়ে গান ধরে না।মাঠে রাখালের বাঁশি বাজে না। জারি,সারি,মুর্শিদী,মারফতি,গানে বাংলার আকাশ বাতাস আর মুখোরিত হয় না।

বাউল, ভাওয়াইয়া,ভাটিয়ালি এসব গান আজ সেকেলে। নেই লাটি খেলা,হা ডু ডু, নৌকা বাইচ,কাঠি নৃত্য, যাত্রা,মঞ্চ নাটক,পালা গান,পুঁথি পাঠ।

সত্যি বলতে বাংলার সর্বত্র আজ বিকৃত সংস্কৃতির চর্চা হচ্ছে এবং তার সাথে সাথে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের নিজস্ব পরিচয় ও ভাবধারা । আমরা প্রায় ভুলেই গেছি কোন একদিন বাঙালি ছিলাম!ttt

আজ অকস্মাৎ কতটি বছর পর ফেলে আসা সেই স্মৃতিঘরে আমি আবার আমাকে ফিরে পেলাম বাঙালি পরিচয়ে যেনো । আলো জ্বলে উঠলো মনের কোণে ফোন এলো যখন ছোট ভাইটির,আপা’ নৌকা বাইছ ‘দেখবেন নাকি? শুনে মনটা কেমন আপ্লুত হলো -নৌকা বাইচ!

আর দেরি না করেই তাইতো বেড়িয়ে পড়লাম। সত্যিই বিষ্ময়! নদীর দু’ ধারে আর সেতুর উপরে উপছে পড়া উৎসুক হাজার মানুষের মিলন মেলা যেনো প্রতিটি প্রানের নতুন করে ভিত্তি স্থাপন করে দিলো ক্ষণিক এই নৌকা বাইচ।

দেখতে দেখতে মনের দর্পণে ভেসে উঠলো কত হারিয়ে যাওয়া প্রতিচ্ছবি, সেই শিশু বেলায় যখন দেখতাম জ্যোৎস্না রাতে ঘরে নেই যুবক, বৃদ্ধ,শিশু। মই দেয়া চাষের জমিনে বাপ,চাচা,মামাদের হা ডু ডু খেলার প্রতিযোগিতা। দূরে কোথাও হতে বাঁশির সুর ভেসে আসছে রাখালের। নকশি কাঁথায় ফোঁড় তুলছে গ্রামের মা ঝিয়েরা। নদীর তীরে, বড় বৃক্ষের নিচে-কোন না কোন মেলা বসেছে। কত পরিচ্ছন্ন ও গোছানো ছিলো সেই দিনগুলো, আত্মার বন্ধন ছিলো কতটা অটুট।

আজ জ্ঞানে, কর্মে, শিক্ষায়, সাংস্কৃতিকে সমাজ তথা দেশের ব্যাপক পরিবর্তন ও প্রসার ঘটেছে ঠিকই তবে অবক্ষয়ের পরিমান বেড়েছে সীমাহীন। পাশ্চাত্য সভ্যতা আমাদের জ্ঞানের পরিধিকে বাড়িয়ে প্রানের নিজস্ব সংস্কৃতিগুলোর উপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া ফেলেছে। আমাদের আবহমানকাল ধরে চলে আসা সেই সব সংস্কৃতিকে হারিয়ে পরিচয়ের দোলাচালে বর্তমান দাঁড়িয়ে আছে প্রযুক্তির খেলা। যদিও আজকের বিশ্ব প্রযুক্তির অবদানে সমৃদ্ধ।
মানুষের কর্মকান্ডকে সহজ করে তুলেছে প্রযুক্তি কিন্ত কমিয়েছে প্রাণের সম্পর্ক এবং কখনো এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া ধ্বংসের কারণ হয়েও দাঁড়িয়েছে। একবার ভেবে দেখেছি কি আমাদের যুব সমাজ কোন দিকে ধাবিত হচ্ছে আজ? আমাদের সন্তানদের সংগে আমাদের দূরত্ব কতটা বেড়েছে? কেন বেড়েছে?
এই ব্যবধানের প্রধান কারণই পরিলক্ষিত হয় ইন্টারনেট। এর মাধ্যমে মিথ্যা কথা বলা,ধোঁকা দেয়া,জুয়া খেলা,ব্লাক মেইল করা,পর্নোছবি দেখা সহ মাদকাসক্তের প্রভাব পড়ছে ব্যাপক আর এই অবক্ষয়ের পথ ধরে আমাদের সংস্কৃতিগুলো আজ চরম সংকটের সম্মুখীন।
তাই আমাদের আগামীকে রক্ষায় নিজস্ব সংস্কৃতির সংগে পরিচিত করিয়ে দেয়ার সময় এসেছে আবার। দেশীয় সংস্কৃতির এই ক্রান্তিলগ্নে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।ফেরাতে হবে আমাদের আগামীদের যন্ত্রজীবন হতে। নইলে বাঙালি জাতি হিসেবে আমরা হারিয়ে যাবো কারণ প্রত্যেক জাতিরই তার নিজস্ব সংস্কৃতির মধ্যেই জাতিসত্তার পরিচয় মিলে–

২১/১০/’১৯

ফেসবুক থেকে সংগ্রহ।।

print

LEAVE A REPLY