ছাত্ররাজনীতি ও আগামীর বাংলাদেশ

ছাত্ররাজনীতি ও আগামীর বাংলাদেশ

0
SHARE
মুহাম্মদ ফেরদৌস আলম:
১৯৪৭ সালে  ব্রিটিশ ভারত বিভজনে পাকিস্তান অধিরাজ্য ও ভারত অধিরাজ্য  নামে দুটি সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠিত হয়।এই বিভক্তিতে বাংলাদেশ, পাকিস্তান অধিরাজ্যভুক্ত হয়।তবে,স্বাধীনতা পূর্বক বাংলাদেশ পর্ব পাকিস্তান হিসাবে পরিচিত ছিলো।
স্বাধীতাত্তোর পশ্চিম পাকিস্তান পূর্বপাকিস্তানের সাথে বৈষম্য,শোষন ও নিপিড়ন শুরু করে।ছাত্রসমাজের তীব্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সকল বৈষম্য,শোষন ও নিপিড়ন প্রতিহত করে দাবি আদায়ের যে গৌরবজ্জ্বৌল  ইতিহাস রয়েছে,যা দেখে ভবিষ্যৎ আলোকিত  বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখা হত।কিন্তু বর্তমান অপছাত্র রাজনীতি তার জন্য অশনিসংকেত হিসাবে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে জড়িয়ে আছে ছাত্র রাজনীতির সুবর্ণখচিত গৌরবজ্জ্বৌল ইতিহাস।  বিশেষ করে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ৫৪’র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ’৬২-র কুখ্যাত শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলন, ’৬৬-র ঐতিহাসিক ৬ দফা ও ১১ দফা, ’৬৯-র গণঅভ্যুত্থান, ’৭০-র নির্বাচন, ’৭১-এ মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনসহ প্রতিটি ঐতিহাসিক বিজয়ে ছাত্রসমাজের ভূমিকা ছিলো অপরিসীম। পরবর্তীতে ’৯১-র স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও  ছাত্র রাজনীতির সুখ্যাতি রয়েছে। এ কারণেই গোড়া থেকে জনগণের কাছে ছাত্র রাজনীতির আলাদা  গ্রহণযোগ্যতা বেশি ছিল কিন্তুু নব্বই পরবর্তী সময়ে লেজুড়বৃত্তি ছাত্ররাজনীতি শুরু হলে অর্থ ও অস্ত্রের অনুপ্রবেশে বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতি কলুষিত হতে শুরু করে।
অভিভাবক প্রতিম রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় আরোহণ কিংবা ক্ষমতায় টিকে থাকতে ছাত্রসংঠনগুলোর অপব্যবহার শুরু করে।ফলে,এক ছাত্রসংঠন অপর ছাত্রসংঠনের নেতা/কর্মী কিংবা সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে সংঘাত/দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পরে।এছাড়াও,ছাত্রসংঠনগুলোর নেতৃবৃন্দের উচ্চাকাঙ্ক্ষা,অর্থ-ক্ষমতার লোভ, অন্তঃকোন্দলসহ সংঘাত/দ্বন্দ্বের কারন হিসাবে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির গত দু’দশকের ইতিহাস সবচেয়ে কলুষিত ও লজ্জাকর।ছাত্রসংঠনগুলোর বিরুদ্ধে উঠে আসা হত্যা,ছিনতাই,চাঁদাবাজি,টেন্ডারবাজি,অগ্নিসংযোগ,দূর্নীতি, ইভটিজিং,ধর্ষণ,ব্লাকমেইল,হামলা-মামলা সহ নানান অভিযোগ।
২০১২ সালের ৯ ডিসেম্বর বিশ্বজিৎ হত্যা,জুবায়ের হত্যা,এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে অগ্নিসংযোগ,আবরার হত্যা,জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে টেন্ডারবাজি,কোটাসংস্কার ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে হামলাসহ নানান অভিযোগ ওঠে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে।সিলেট ছাত্রদলের অন্তঃকোলহে ফয়জুর রহমান হত্যা,ছাত্রলীগ নেতা মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ হত্যাসহ নানান অভিযোগ ওঠে ছাত্রদলের বিরুদ্ধে।এছাড়াও বিভিন্ন অভিযোগ ওঠে তুলনামূলক ছোট ছাত্রসংঠনগুলোর বিরুদ্ধে।আর এজন্যই জনগনের গ্রহণযোগ্যতা হারাচ্ছে ছাত্রসংঠনগুলো।
অভিভাবকবৃন্দ সন্তানদের রাজনীতি থেকে  দূরে থাকতে নিষেধ করছে,৭০-৮০% মানুষ রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।অপছাত্র রাজনীতির জন্যই ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি করছে জনগন,পলিটিশিয়ানসহ খোদ সাধারণ শিক্ষার্থীরা।তবে,কি ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধই সব সমস্যার সমাধান হতে পারে?না।
তবে,লেজুড়বৃত্তি মুক্ত,স্বাধীন ও স্ব-পলিসীতে ছাত্ররাজনীতি নিশ্চিৎ করা যায় তবে,অতীত স্বর্ণকাল ফিরে পেতে পারি।আমরা যদি যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা,অষ্ট্রলিয়াসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রের ছাত্র রাজনীতির দিকে তাকাই,তাহলে দেখি তারা স্বাধান  ও স্বপলিসি রাজনীতি করতে।পাশাপাশি অনেক সংগঠন ছাত্রসংঠনগুলো নিয়ে কাজ করতে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর এমিরেটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মতে,‘ছাত্র রজনীতি বন্ধ করলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে৷ তখন ছাত্রেদের কোনো কন্ঠই থাকবে না৷ সরকার, প্রশাসনের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা পাবে৷ অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার কেউ থাকবে না৷ প্রয়োজন দলীয় লেজুড়বৃত্তির ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করা৷ এটা শিক্ষকদের জন্যও প্রজোয্য৷ তারাও দলীয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন পদ বা সুবিধা পাওয়ার আশায়৷ দুই ক্ষেত্রেই দলীয় রাজনীতি বন্ধ করে আদর্শিক রাজনীতির চর্চা করতে হবে৷ যদি ছাত্র রাজনীতিই বন্ধ করে দেয়া হয় তাহলে অপশক্তিই সুবিধা পাবে৷ ছাত্র সংসদগুলোতে যদি নিয়মিত নির্বাচন হতো, কার্যকর থাকতো, তাহলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না৷”

ছাত্ররাজনীতির মুল লক্ষ্যানুযায়ী যদি ছাত্রসংঠনগুলো কাজ করে, তবে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাগুলো সামনে আসবে না।প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার একটি প্রবন্ধে ছাত্র রাজনীতির মূল লক্ষ্য সম্পর্কে লিখেছিলেন- “ছাত্র রাজনীতির মূল লক্ষ্য হচ্ছে সমাজ, দেশ ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বদানে নিজেকে গড়ে তোলা”।

ছাত্রসমাজ যদি তাদের মূল আদর্শে ফিরে গিয়ে,অতীত গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস  সামনে রেখে আলোকিত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে নিয়মতান্ত্রিক  ভাবে রাজনীতি করে, তাহলে সুখ্যাতি অর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশকে প্রকৃত সোনার বাংলা হিসাবে গড়ে তুলবে।

মুহাম্মদ ফেরদৌস আলম।

fardawsh97@gmail.com

উলিপুর, কুড়িগ্রাম। 

print

LEAVE A REPLY