পানিই যদি না থাকে, তিস্তা চুক্তি দিয়ে কী হবে!

পানিই যদি না থাকে, তিস্তা চুক্তি দিয়ে কী হবে!

0
SHARE

নিউজ ডেস্ক:

কতটা জল ভারত রাখবে আর কতটা জল বাংলাদেশে পাবে, তার আনুপাতিক হার ঠিক হলেও যদি শুখা সময় হয়, পানিই নদীতে না থাকে, তবে কী হবে? আবার জলের ধারা প্রবল হলে?

‘দিল্লি থেকে বলছি: তিস্তা বিতর্কের বৃত্তান্ত’ শিরোনামে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বাংলায় সাংবাদিক জয়ন্ত ঘোষালের সেই প্রতিবেদনটি তুলে ধরা হলো।

তিস্তা এক নদীর নাম। সিকিম নামক ভারতের এক ছোট্ট অঙ্গরাজ্য থেকে এই নদীর জন্ম। তারপর পশ্চিমবঙ্গ হয়ে এই নদী পৌঁছলো বাংলাদেশ। ভারত আর বাংলাদেশের মধ্যে ৫৪টি ছোট-বড় নদীর সংযোগ। বাংলাদেশের রংপুর ডিভিশনে গিয়ে তিস্তার আপাতত সমাপ্তি। নদী বেসিনে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩০ মিলিয়ন (৩ কোটি)। যে ৫৪টি নদী ভারত আর বাংলাদেশ দুদেশের মধ্যে প্রবাহিত, তাদের মধ্যে তিস্তা চতুর্থ বৃহত্তম। সেই কবে থেকে শুনে আসছি, তিস্তার পানি অথবা জল নিয়ে দুদেশের মধ্যে বিবাদ এবার মিটতে চলেছে।tista pp

ভারতের মানুষ বলে জল, বাংলাদেশে বলে পানি। কিন্তু এই জল বা পানির বিবাদ কি সত্যিই এবার মিটতে চলেছে? ভারতে গাজলডোবা বাঁধ এই জলপ্রবাহকে অনেকটা রুদ্ধ করে, আবার বাংলাদেশেও জলিয়া ব্যারেজ দেওয়া হয়েছে। দুপক্ষের নদী কমিশন দীর্ঘদিন ধরেই এই জল বন্টন নিয়ে আলাপ-আলোচনা চালিয়েছে। ঢাকা থেকে ইঞ্জিনিয়াররা এসে একাধিকবার এই বাঁধ পর্যবেক্ষণ করেছেন। বেশ কিছু নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করা হয়েছিল যাতে বাংলাদেশ এই জলপ্রবাহ থেকে বঞ্চিত না হয়।

ভারতের রাজনীতিতে তিস্তার জল খুব বড় রাজনৈতিক ইস্যু নয়। এদেশে যেভাবে কাশ্মীরের ৩৭০ ধারার অবলুপ্তি বা নাগরিকপঞ্জি গঠন একটা বড় ইস্যু হয়েছে, ঠিক সেভাবে নিশ্চয়ই তিস্তা নদীর জলবন্টন ইস্যু হয় না। কিন্তু বাংলাদেশের জনসমাজে আজও তিস্তা একটা বড় অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়। আমি যতবার ঢাকায় গেছি, কখনো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা, কখনো টেলিভিশন চ্যানেলের দর্শকদের প্রশ্নেবাণের সম্মুখীন হয়ে দেখেছি, ঢাকার মানুষের একটা বড় অংশের মনস্তত্ত্বের মধ্যে নিহিত আছে, “ভারত আমাদের পানি দিচ্ছে না। বাংলাদেশকে বঞ্চিত করা হচ্ছে”।

বাস্তব পরিস্থিতি যে কিঞ্চিৎ ভিন্ন, সেটা বাংলাদেশের শীর্ষস্তরের আসীন কিছু ব্যক্তিত্ব হয়তো বুঝতে পারছেন, কিন্তু আমজনতাকে সেসব যুক্তি-তর্ক বোঝানো কঠিন। আসলে মনমোহন সিংহ-প্রণব মুখোপাধ্যায় তিস্তা চুক্তি সত্যি সত্যিই করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তীব্র বিরোধিতায় তা বাস্তবায়িত করা সম্ভব হয়নি। আজও নরেন্দ্র মোদী তিস্তা চুক্তি করতে আন্তরিকভাবে আগ্রহী, কিন্তু এখনো যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিক থেকে অনেক ওজর আপত্তি আছে, একথা যতই বোঝানোর চেষ্টা করুন, ভারতের সেসব যুক্তি বোঝার চেয়ে বাংলাদেশের মানুষের সাধারণভাবে একটা অভিযোগ, অভিমান বলতে পারেন, দৃঢ়ভাবে শিকড় বিস্তার করেছে, যে ভারত তিস্তা দিচ্ছে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তো একবার মনে আছে, ছাত্রছাত্রীরা কার্যত বেশ আক্রমণাত্মক হয়েই আমাকে জিজ্ঞাসা করেন, কেন আপনারা আমাদের তিস্তা দিচ্ছেন না? যতই বোঝানোর চেষ্টা করি যে আমি আসলে ভারত সরকারের, এমনকি মমতা সরকারেরও প্রতিনিধি নই, আমি তো একজন স্বাধীন ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি।

আসলে নদীমাতৃক দেশে সভ্যতা ও বিকাশ অনেকসময়ই নদীনির্ভর হয়। নীল নদ থেকে গঙ্গা-পদ্মা, এই ঐতিহ্য, এই ইতিহাস, আমাদের সকলেরই তো জানা। কিন্তু এর আগে গঙ্গা চুক্তিও করেছিলেন শেখ হাসিনা, তখন দেবগৌড়া ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। জ্যোতি বসু মুখ্যমন্ত্রী। শেখ হাসিনা দিল্লির বঙ্গভবনে জ্যোতিবাবুর সঙ্গে বৈঠক করলেন যেদিন, সেদিন আমি বঙ্গভবনে গেছিলাম পাঁচতলার সেই ঘরটিতে। দুজনেই খুব আশাবাদী ছিলেন এই গঙ্গা চুক্তি নিয়ে। বিজেপি সেদিন গঙ্গা চুক্তির বিরোধিতা করে এবং রাজ্য বিজেপির ধারণা ছিল, এই চুক্তির ফলে বাংলা বঞ্চিত হবে। সিপিএম-বিরোধী প্রচারের ইস্যু হয়েছিল। দেবগৌড়ার পর গুজরালও বাংলাদেশের জন্য খুবই ইতিবাচক প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। বস্তুত, তাঁর ‘গুজরাল ডকট্রিন’ তো বাংলাদেশের সঙ্গে মৈত্রী স্থাপনে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। কিন্তু পরে বাংলাদেশ থেকে অভিযোগ ওঠে, ভারত গঙ্গা চুক্তি মেনে পানি দিচ্ছে না।

এবার শেখ হাসিনা ভারতে আসছেন বেশ কিছুদিন পর। বাংলাদেশের বিদেশমন্ত্রী জানিয়ে দিয়েছেন যে নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে বৈঠকে তিস্তা নিয়েও ঢাকা আলোচনা করবে। আমিও ভারতের বিদেশমন্ত্রক থেকে যা জানতে পারছি তা হলো, বাংলাদেশ উত্থাপন করলে ভারতও তিস্তা নিয়ে আলোচনা করতে প্রস্তুত। তিস্তাচুক্তি এ সফরে ঘোষণা না হলেও এই চুক্তির পক্ষে ইতিবাচক লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করা দুদেশের উদ্দেশ্য। শেখ হাসিনা পদ্মার ইলিশ যেন ভারতের, বিশেষত বাংলার, মানুষ পান, দিল্লি আসার আগে তার ব্যবস্থা করেছেন। মমতা নিজে হাসিনাকে অনুরোধ করেন। কূটনীতিতে এসব হলো ‘ফিল গুড মুভ’। অনেকসময় বড় বড় জটিল বিষয়ের চেয়ে এ ধরনের পদক্ষেপ বেশি প্রভাব ফেলে।

আসলে তিস্তা চুক্তি হলেই যে বাংলাদেশে জল পাবে, এমন নয়। কারণ তিস্তায় কখন কতটা জল থাকবে তার ওপরই জলবন্টন নির্ভর করবে। কতটা জল ভারত রাখবে আর কতটা জল বাংলাদেশে পাবে, তার আনুপাতিক হার ঠিক হলেও যদি শুখা সময় হয়, জলই নদীতে না থাকে, তবে কী হবে? আবার জলের ধারা প্রবল হলে? জল বিশেষজ্ঞরা বলেন, জলের প্রবাহ তো প্রকৃতির নিয়মে নিচের দিকে যাবে। তাই ভারত চাক বা না চাক, বাংলাদেশ জল পাবেই। ভারতের এই যুক্তি বাংলাদেশের পানি বিশেষজ্ঞরা অনেকে মানেন না। তাঁরা বলছেন, বাঁধ করে ভারত জল আটকেও রাখে।

আবার মমতা অভিযোগ করেছিলেন সিকিমের বিরুদ্ধে। সিকিম সরকার অনেকগুলি জল বাঁধ নির্মাণ করার ফলে উত্তরবঙ্গ বঞ্চিত হচ্ছে বলে তাঁর দাবি। এজন্য বাংলাদেশকে জল দেওয়া কঠিন হচ্ছে। সিকিম আবার এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ঢাকা বলছে, জল না থাকলে জল পাব না, কিন্তু তা বলে চুক্তি কেন করা হবে না? অনেকে আবার বলছেন, মোদী চাইলেই এখনই শক্ত হাতে তিস্তা চুক্তি করে ফেলতে পারেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্মতি ছাড়াই। মোদী সরকার প্রবলভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার, আর মমতাও এখন পশ্চিমবঙ্গে আগের চেয়ে দুর্বল, কারণ আঠারোজন সাংসদ হওয়ার পর বিজেপি এখন পশ্চিমবঙ্গে আক্রমণাত্মক।

আবার মমতা মনমোহনের সময় তিস্তা নিয়ে যতটা কঠোরতা প্রদর্শন করতেন, এখন তা করছেন না। এরমধ্যে শেখ হাসিনার সঙ্গেও মমতার একাধিকবার কথা হয়েছে। মমতা আমাকে একান্তে বলেছেন, “আমি বাংলাদেশে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে নই, কিন্তু আমার রাজ্যের উত্তরবঙ্গের মানুষ জল থেকে বঞ্চিত হবে, এমন কোনো চুক্তি আমি কিভাবে হতে দিতে পারি!”

কল্যাণ রুদ্র জল বিশেষজ্ঞ, তাঁর নেতৃত্বে একটি কমিটিকে এই ব্যাপারে রিপোর্ট দিতে বলেছিলেন মমতা। কল্যাণবাবু সে রিপোর্ট জমা দিয়ে দিয়েছেন অনেকদিন হলো। সেই রিপোর্ট অবশ্য আজও প্রকাশিত নয়। তবে এক শীর্ষ আমলার কাছে শুনেছিলাম, অনেকগুলি জলাধার উত্তরবঙ্গে নির্মাণ করে সমস্যা সমাধানের একটা পথ সেই রিপোর্টে বলা আছে। আর এই জলাধার প্রকল্পগুলির জন্য কেন্দ্রও আর্থিক সহযোগিতা দিতে রাজি।

মনে হচ্ছে এবার হাসিনাও বিষয়টি নিয়ে চাপ দেবেন, কারণ বাংলাদেশের মানুষের কাছেও এটি একটি মস্ত বড় মনস্তাত্ত্বিক বিষয়। আর মোদীও বুঝছেন আজ গোটা বিশ্ব রাজনীতি যে পথে এগোচ্ছে, চীন-পাকিস্তান অক্ষ যেভাবে সক্রিয়, সন্ত্রাস বা জঙ্গি ফেরত পাঠানো, পাকিস্তান বিষয়ে বাংলাদেশ যেভাবে সদর্থক ভূমিকা পালন করছে, তাতে বাংলাদেশের জন্য এবার মোদীর দ্বিতীয় ইনিংসে তিস্তা চুক্তি করে ফেলা প্রয়োজন। ভারত সীমান্ত চুক্তি করেছে। নাগরিকপঞ্জি আসামের যাই হোক, আপাতত একজন ব্যক্তিকেও বাংলাদেশের নাগরিক চিহ্নিত করে ঢাকায় ফেরত পাঠানো হবে না। তাই তিস্তা চুক্তি না করার কোন কায়েমি স্বার্থ ভারতের পক্ষ থেকে নেই।

সমস্যা হচ্ছে, তিস্তা নিয়ে যদি গোলমাল কিছু হয় হয়ে থাকে, তবে সেটা হয়েছিল মনমোহনের সময়। প্রণব মুখোপাধ্যায়কে বাংলাদেশ তথা হাসিনা কার্যত তাঁদের অভিভাবক মনে করেন। প্রণববাবু চেয়েছিলেন ক্যাবিনেটে তিস্তা চুক্তি পাস করিয়ে নিতে। আলোচনা-টালোচনা পরে হবে। ক্যাবিনেটের নোট তৈরি হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তখন কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী দীনেশ ত্রিবেদী ছিলেন মমতার তৃণমূল কংগ্রেসের সদস্য। তিনি আগের দিন রাতে খসড়া চুক্তির কথা দিদিকে জানান। দিদি সেই রিপোর্টটি শুনেই বলে দেন, “এটার বিরোধিতা করতে হবে। এই চুক্তি আমরা মানছি না। আর আমাদের রাজ্য সরকারের সঙ্গে আলোচনা না করে এই চুক্তি তুমি করতে পারবে না।” তার পরের দীর্ঘ ইতিহাস তো সবার জানা।

মমতার সঙ্গে আলোচনার জন্য মুখ্য সচিব পি কে নায়ার, তারপর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শিবশঙ্কর মেনন, অথবা বিদেশ সচিব পিল্লাইদের মত আমলা ও কূটনীতিকদের পাঠানো ভুল কৌশল ছিল। আমি তো বলেছিলাম, জয়রাম রমেশের মতো কোনও রাজনৈতিক নেতাকে দৌত্য করতে পাঠাতে, যাঁর কোন ইগোর সমস্যা ছিল না। যা হোক, সেটা হয় নি। উল্টে তৎকালীন ঢাকার বিদেশমন্ত্রী দীপুমনি তৎকালীন হাইকমিশনার তারিক করিমকে সঙ্গে নিয়ে মমতার সঙ্গে কলকাতায় দেখা করতে গিয়ে প্রবল বাদানুবাদে লিপ্ত হয়ে পরিস্থিতি আরো জটিল করে তোলেন। গহওর রিজভিকে তা সামলাতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল।

তবে নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর মমতা একই সময়ে ঢাকা যান। সে সময় আমিও গিয়েছিলাম। মোদী মমতাকে তাঁর নিজের গাড়িতে বসিয়ে হাসিনার সঙ্গে দেখা করতে যান। বরফ সেদিন থেকেই গলছে। এবারের সফরে তাই প্রকাশ্যে ঘোষণা হোক বা না হোক, তিস্তা আলোচনা হওয়া স্বাভাবিক। সমাধানের লক্ষ্যে জট খোলার কাজটা একটু এগোক, এটাই কাম্য।

সুত্র: কালের কন্ঠ

print

LEAVE A REPLY