আড়াই বছরেও পূর্ণবাসন হয়নি গোবিন্দগঞ্জের উচ্ছেদ হওয়া সাঁওতালদের

আড়াই বছরেও পূর্ণবাসন হয়নি গোবিন্দগঞ্জের উচ্ছেদ হওয়া সাঁওতালদের

0
SHARE

জিল্লুর রহমান পলাশ, গাইবান্ধা :
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের সাঁওতাল পল্লী থেকে উচ্ছেদ হওয়া বাঙালী ও ক্ষুদ্ধ নৃ-গোষ্ঠির মানুষদের আড়াই বছরেও পূর্ণবাসন করা হয়নি।

বাপ-দাদার সম্পত্তি ফেরতের আশায় ঝড়-বৃষ্টিতেই এখনো অস্থায়ী অবাসেই মানবেতর জীবন কাটছে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর। এদিকে, হামলার ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার তদন্ত কার্যক্রমে দৃশ্যমান অগ্রগতি ও প্রকৃত জড়িতরা আজও ধরাছোয়ারা বাইরে। এতে সুষ্ঠ বিচারকার্যক্রম নিয়ে শষ্কিত ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো। তবে আলোচিত এ মামলার চার্জশীট দ্রুতই আদালতে দাখিলের কথা জানিয়েছে তদন্ত সংশ্লিষ্ট পিবিআই কর্মকর্তা।

২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে রংপুর চিনিকলের জমি দখলকে কেন্দ্র করে সাঁওতালদের বসতিতে হামলা-ভাঙচুর, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের গুলিতে তিন সাঁওতাল হত্যার ঘটনা ঘটে। উচ্ছেদ হওয়া সাঁওতাল পরিবাগুলো আশ্রয় নেয় মাদারপুর ও জয়পুরপাড়া গ্রামের খোলা আকাশের নিচে।6

সেখানে ছোট ছোট টিনের চালা আর ঝুপড়ি ঘর তুলে বসবাস শুরু করে দুই শতাধিক সাঁওতাল পরিবার। রোদ-বৃষ্টি, ঝড় আর নানা কষ্টে আড়াই বছর ধরে মানবেতর জীবন কাটছে সাঁওতাল পরিবারগুলোর।

চাঞ্চল্যকর ও মানবিক বিপর্যয়ের ঘটনা তোলপাড় হয় বিশ্বজুড়ে। ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ, নিন্দাসহ সাঁওতাল জনগোষ্ঠির নিরাপত্তা ও পূর্ণবাসনের ব্যবস্থা নেয়া এবং তাদের বাপ-দাদার সম্পত্তি ফেরতের দাবি উঠেছিল সর্বমহলে।

আন্দোলন, সংগ্রাম অব্যহত থাকলেও এসব দাবির কোনটাই আজও পূরণ হয়নি। এছাড়া হামলার ঘটনায় অনেকে বেঁচে আছেন শরীরে ক্ষত চিহ্ন নিয়ে। পূর্ণবাসন, সম্পত্তি ফেরত না পাওয়া এবং মামলার তদন্ত কার্যক্রমে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় অসন্তোষ বিরাজ করছে সাঁওতালদের মাঝে।

সরেজমিনে গেলে, মাদারপুর ও জয়পুরপাড়ায় আশ্রয় নেয়া ক্ষতিগ্রস্ত মানুষরা প্রতিবেদকের কাছে তাদের ক্ষোভ, অসহায়ত্ব ও মানবেতর জীবন যাপনের কথা জানান। ক্ষতিগ্রস্ত নারী সাঁওতাল আমেনা হেমব্র বলেন, ‘ঘটনার দিন হামলা, আগুনে কিছুই রক্ষা করতে পারিনি। কোন রকমে এসে গাছতলায় আশ্রয় নেই। সেখানে ছোট টিনের ঘরে স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে বসবাস করছি। রোদ, বৃষ্টি আর ঝড়ের মধ্যে আড়াই বছর ধরে নানা কষ্টে বসবাস করতে হচ্ছে তাদের। ঘটনার পর পূর্ণবাসনের আশ্বাসসহ সরকারের পক্ষ থেকে যেসব প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিলো তাও বাস্তবায়ন হয়নি। সুরহা হয়নি বাপ-দাদার সম্পত্তি ফেরতের’।

মাদারপুর গির্জার সামনে আশ্রয় নেয়া সাঁওতাল সরেন টুডু বলেন, ‘বসতিঘর, জমি ও ফসলের অধিকার হারিয়ে সাঁওতালদের আশ্রয় হয় মাদারপুর, জয়পুরপাড়াসহ বিভিন্ন গ্রামে। খোলা আকাশের নিচে ঝুপড়ি ঘরগুলোতে কোন রকম মাথা গোজার ঠাঁই হলেও চরম অর্থকষ্টে দিন কাটছে সাঁওতাল পরিবারগুলোর। হামলায় আহত অনেকে কর্মহীন হয়ে পড়ায় বিনা চিকিৎসায় মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন। করতে পারেনা।

ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটির সহ-সভাপতি ফিলিমন বাস্কে বলেন, ‘হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট, অগ্নিসংযোগসহ তিনজনকে গুলি করে হত্যার ঘটনা ঘটে। হামলার ঘটনায় নিহত ও আহত পরিবারগুলোর আজও দিনকাটছে খেয়ে না খেয়ে। মিথ্যা মামলা, গ্রেফতার নির্যাতন ও হুমকির কারণে প্রতিনিয়ত আতষ্কে থাকতে হয় আশ্রয় নেয়া ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর। তারপরেও বাপ-দাদার সম্পত্তি ফেরত আর সুষ্ঠ বিচারের আশায় অনড় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো আন্দোলন-সংগ্রাম করে আসছেন। কিন্তু আজও এসবের সুরহা না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি’।

মামলার বাদি থমাস হেমব্রন বলেন, ‘উচ্ছেদ, হামলা ও হত্যার ঘটনার সাবেক এমপি আবুল কালাম আজাদ, ইউপি চেয়ারম্যান শাকিল আহমেদ বুলবুল, মিলের এমডি ও স্থানীয় প্রভাবশালীসহ ৩৩ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করি। কিন্তু মামলার অগ্রগতি নেই। ঘটনার আড়াই বছরেও মামলার তদন্ত কার্যক্রম শেষ হয়নি। তাছাড়া জড়িত আসামিদেরও গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। এ অবস্থায় বিচার কার্যক্রম নিয়ে শষ্কা প্রকাশ করেন তিনি। তবে দ্রæত আদালতে চার্জশীট দাখিল করে সুষ্ঠ বিচারের পাশাপাশি পূর্বপুরুষদের ভিটেমাটি ফেরতের দাবি জানান তিনি’।

উচ্চ আদালতের নির্দেশে চাঞ্চল্যকর মামলাটির তদন্ত করছে পুলিশ বুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এ বিষয়ে পিবিআই গাইবান্ধার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল লতিফ বলেন, ‘মামলায় এ পর্যন্ত ২৫ জনকে গ্রেফতার করে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। আসামিদের দেওয়া স্বীকারোক্তি জবানবন্দিতে উদ্ধার করা হয়েছে লুটপাট হওয়া ঢেউটিন, রিকশা, ভ্যান ও শ্যালোমেশিনসহ বিভিন্ন মালপত্র। ইতোমধ্যে মামলার তদন্ত কার্যক্রম শেষ হয়েছে। আদালতে চার্জশীট দাখিলের বিষয়টি উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের অনুমতির অপেক্ষায় রয়েছে। তবে আগামি মাসের মধ্যে আদালতে চার্জশীট দাখিলের আশ্বাস দেন তিনি। এ মামলায় প্রভাবশালীসহ জড়িত প্রৃকত অপরাধীদের কেউ ছাড় পাবেনা বলেও জানান তিনি’।

এদিকে, তিগ্রস্ত ও গৃহহীন সাঁওতাল পরিবারের পূর্ণবাসনসহ তাদের জীবন মান উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগের কথা স্থানীয় প্রশাসন। গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রামকৃষœ বর্মণ বলেন, ‘সাঁওতালদের পুর্ণবাসনে দুটি গুচ্ছগ্রাম নির্মাণ করা হয়েছে, বর্তমানে গুচ্ছগ্রামে ৭০টি পরিবার বসবাস করছে। এছাড়া বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, শিক্ষা সুবিধাসহ ক্ষতিগ্রস্ত সাঁওতালদের সেলাই মেশিন বিতরণ এবং বিভিন্ন কর্মসূচির আওতায় সহায়তা করা হচ্ছে। তাদের পূর্ণবাসনে আরও দুটি আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর নির্মাণ কাজ চলছে। সবমিলে সাঁওতালদের জীবন মান উন্নয়নে সরকার ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি’।

print

LEAVE A REPLY