ডিজিটাল যুগে ডাকঘরের ব্যবহার

ডিজিটাল যুগে ডাকঘরের ব্যবহার

0
SHARE

শাহিনুর রহমান,শাহিনঃ

দেশের প্রতিটি স্তরে উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে, ডিজিটালিস যুগ আরও দ্রুত অগ্রগতির দিকে যাচ্ছে। তবে সময় এসেছে এবার স্থানীয় ডাকঘরগুলোর নজরদারি করার।

‘সেবাই আদর্শ’—স্লোগানটি ঐহিত্যবাহী বাংলাদেশ ডাক বিভাগের। একসময়ের যোগাযোগের জনপ্রিয় এ প্রতিষ্ঠানটি বর্তমান ইন্টারনেট ও ই-মেইলের যুগেও এগিয়ে চলছে।

যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম চিঠি প্রিয়জনের কাছে পৌঁছানোর কাজটি দীর্ঘদিন ধরেই করে আসছে ডাক বিভাগ। ইন্টারনেট যুগে চিঠির প্রচলন কমে গেলেও একেবারে বন্ধ হয়নি। পাশাপাশি এই চিঠি চালাচালিতে যে প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছে ডাক বিভাগ।নানা কার্যক্রমে যুক্ত ডাকঘর জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছে।

নিজেদের কার্যক্রমকে প্রযুক্তিবান্ধব করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সুবিধার কথা মাথায় রেখে বিভিন্ন প্রযুক্তিসুবিধা চালুকরেছে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ।

গ্রামীণ পোস্ট অফিস ই-কেন্দ্র

দেশের সাধারণ মানুষের বড় একটি অংশ গ্রামে থাকে। এই গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কাছে ইন্টারনেট সেবা ও অন্যান্য প্রযুক্তির সুফল পৌঁছানোর জন্য ডাক বিভাগের প্রায় আট হাজার গ্রামীণ ডাকঘর ও ৫০০ উপজেলা ডাকঘরকে পোস্ট অফিস ই-সেন্টার হিসেবে তৈরির কাজ চলছে। এ প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি গ্রামীণ শাখা ডাকঘরে ল্যাপটপ, ফটোপ্রিন্টার, মোবাইল ফোন, স্ক্যানার, ডিজিটাল ক্যামেরা, ওয়েবক্যাম ইত্যাদি ইন্টারনেট সুবিধাসহ থাকবে।

এসবের পাশাপাশি প্রযুক্তি-সম্পর্কিত জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কর্মশালা, প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও রাখা হবে। গ্রামীণ ডাকঘরগুলোয় সহজ সেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য দেশের প্রায় আট হাজার ডাকঘরের পোস্টমাস্টারদের বিশেষ সিমকার্ড ও মোবাইল ফোনসেট দেওয়া হয়েছে। এতে করে পোস্টমাস্টাররা বাণিজ্যিকভাবে কলসহ অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবেন। ভবিষ্যতে ইলেকট্রনিক মানি অর্ডার সেবাকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিয়ে যেতে এই মোবাইল ফোনসেটগুলো কাজে লাগানো হবে বলে জানা গেছে

ডাকঘরে প্রযুক্তিসেবা

ডাকঘরের নানা কাজে এখন যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তিসেবা। বিশ্বস্ত মানি অর্ডারের মাধ্যমে টাকা পাঠানোর কাজ এখন দ্রুততার সঙ্গে করা যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের কাগজ-কলমের কাজগুলো সহজ করতে চালু হচ্ছে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা। ডাক বিভাগ মোবাইল ফোন ব্যবহার করে টাকা পাঠানোর কাজটাকে দ্রুত ও সহজ করেছে। সারা দেশের জেলা পর্যায়ের ডাকঘরগুলোয় রয়েছে এসব প্রযুক্তিসেবা।

কম্পিউটারের মাধ্যমে যানবাহনের কর

অনেক দিন ধরেই ডাকঘরের মাধ্যমে যানবাহনের কর প্রদান করতে হতো। দীর্ঘ সারিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। করদাতার দুর্ভোগ দূর করতেই ডাক বিভাগ চালু করেছে অনলাইনে যানবাহনের কর পরিশোধের ব্যবস্থা। দেশের
প্রায় ৯১টি ডাকঘরে বর্তমানে মোটরযান কর আদায়ে কম্পিউটারভিত্তিক লেনদেন চালু হয়েছে। এর ফলে ডাকঘরের কাউন্টারে যানবাহন কর জমা দেওয়ার জন্য গ্রাহককে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হয় না। ওই সময়টি কমে এখন পাঁচ মিনিটের মধ্যেই কম্পিউটারে তৈরি হওয়া টাকার রসিদ দেওয়াসহ লেনদেন সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে বলে জানান তিনি। টাকা জমা দেওয়ার পর মুঠোফোন থেকে একটি নির্দিষ্ট নম্বরে এসএমএস পাঠাতে হয়। এরপর ফিরতি এসএমএসে গ্রাহক জানতে পারবেন টাকা সরকারি খাতে জমা হয়েছে কিনা। এ অনলাইনে পদ্ধতি চালুর ফলে গত অর্থবছরে প্রায় ১০০ কোটি টাকা বাড়তি আয় হয়েছে। বাংলাদেশ ডাক বিভাগের ওয়েবসাইটে (www.bangladeshpost.gov.bd) এরকম বিভিন্ন সেবার তথ্য রয়েছে।

ইলেকট্রনিক মানি অর্ডার

ডাকঘরের নানা কার্যক্রমের মধ্যে মানি অর্ডার অন্যতম। প্রিয়জনের কাছে টাকা পাঠাতে কিংবা টাকা পেতে দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে এই প্রক্রিয়া। পুরোনো দিনের মানি অর্ডার কার্যক্রমকে সহজ করতে চালু হয়েছে ইলেকট্রনিক বা মোবাইল মানি অর্ডার। প্রচলিত মানি অর্ডার সেবার পাশাপাশি বর্তমানে দেশের সব জেলা সদরের প্রধান ডাকঘরসহ গুরুত্বপূর্ণ সাব পোস্ট অফিস ও উপজেলা পর্যায়ের প্রায় ৬০৩টি ডাকঘরে চালু হয়েছে ইলেকট্রনিক মানি ট্রান্সফার সার্ভিস (ইএমটিএস)। মুঠোফোন ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে দ্রুততার সঙ্গে এসব অফিসে টাকা পাওয়া যাবে। চলতি বছরের মধ্যেই এ কার্যক্রম আরও প্রায় এক হাজার ৬০০ ডাকঘরে সম্প্রসারিত হবে। এ কার্যক্রমটি ছড়িয়ে দিতে প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার, যন্ত্রাংশ, সার্ভারকক্ষ ও সংযোগ স্থাপনের কাজগুলো প্রায় শেষ হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দ্রুততার সঙ্গে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি দ্রুততম সময়ে দেশের সব ডাকঘরে ইএমটিএস সুবিধা চালু করা হবে।

ডাকঘরের স্বয়ংক্রিয় কার্যক্রম

ডাকঘরের সব কার্যক্রমকে কম্পিউটার ও সফটওয়্যারভিত্তিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ‘প্রসেস অটোমেশন অব পোস্টাল ডিপার্টমেন্ট’ প্রকল্পের আওতায় প্রথম পর্যায়ে দেশের ৭১টি ডাকঘর ও ১৩টি মেইল অ্যান্ড সর্টিং অফিসকে স্বয়ংক্রিয় করার কার্যক্রম চলছে। ইতিমধ্যে একটি ওয়েবভিত্তিক সফটওয়্যার তৈরির কার্যক্রম চলছে। চলতি বছরের মধ্যেই এ কার্যক্রম চালু হবে, যার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ডাকঘরের কাউন্টার সেবাসহ সব কাজ কম্পিউটারভিত্তিক হবে। ডাকে পাঠানো দ্রব্যের হদিস জানাও (ট্র্যাকিং ও ট্রেসিং) সম্ভব হবে খুব সহজে। এ প্রকল্পের আওতায় ধীরে ধীরে সব বিভাগীয় অফিস ও প্রশাসনিক অফিস স্বয়ংক্রিয়করণের আওতায় নিয়ে আসা হবে।

পোস্টাল ক্যাশ কার্ড

ডাক বিভাগের সব সেবার লেনদেন কার্যক্রম তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ও ডিজিটাল পদ্ধতিতে রূপান্তরিত করার জন্য চালু হয়েছে পোস্টাল ক্যাশ কার্ড সুবিধা। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে সীমিতসংখ্যক ডাকঘরে আনুষ্ঠানিকভাবে পোস্টাল ক্যাশ কার্ড সেবাটি চালু হয়েছে, যা পর্যায়ক্রমে দেশের প্রায় এক হাজার ৬০০ পোস্ট অফিসে সম্প্রসারিত করা হবে। এ কার্যক্রম চালুর ফলে ডাক বিভাগের মাধ্যমে লেনদেন কার্যক্রমটি ইলেকট্রনিক কার্ডনির্ভর হবে, যা গ্রাহকদের জন্য বিশেষ সুবিধা হবে।

ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন মানি অর্ডার

ডাক বিভাগের প্রায় ৫৫০টি ডাকঘরে ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নের টাকা স্থানান্তর কার্যক্রম চলছে। ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নের মাধ্যমে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ ডাক বিভাগ দেশের অভ্যন্তরে প্রত্যন্ত অঞ্চলে গ্রাহকদের হাতে সহজে পৌঁছে দিচ্ছে। চলতি বছরে আরও এক হাজার ২০০টি ডাকঘর থেকে এ সেবা দেওয়া হবে।

এ কার্যক্রমের ফলে ডাক বিভাগের নিজস্ব আয় যেমন বেড়েছে, তেমনি উপজেলা পর্যায়ের গ্রাহকেরা সহজে সেবাটি পাচ্ছেন, অন্যদিকে বৈধ পথে আসা প্রবাসীদের রেমিট্যান্স জাতীয় অর্থনীতিতেও বিশেষ অবদান রাখছে।

সূত্র: প্রথম আলো

print

LEAVE A REPLY