নির্জন ছেঁড়া দ্বীপে একটি মাত্র পরিবারের সংগ্রামী জীবনযাপন 

নির্জন ছেঁড়া দ্বীপে একটি মাত্র পরিবারের সংগ্রামী জীবনযাপন 

312
0
SHARE

শাহিনুর রহমান শাহিন:

চারদিকে উত্তাল সমুদ্রের ঢেউ, কুমির-কচ্ছপের দৌড়ঝাঁপ, জনমানব শূন্য একটি উঁচু জায়গা। আশে পাশে কোন বাড়ি-ঘর, জীবজন্তুু, হাট বাজার, কোলাহল নেই।

আপনার কেমন লাগবে? নিশ্চয় ভাল লাগার কথা নয়। মানুষের সংস্পর্শবিহীন, একাকী নির্জন, নিভৃতে কয়দিন থাকা যায়! যেকোনো মানুষের পক্ষে এই দু:সাধ্য সাধন করা প্রায় অসম্ভব।57070927_343457836152251_7779196670918524928_n

কিন্তুু হ্যাঁ! এই অসম্ভবকে সম্ভব করে বাবার রেখে যাওয়া স্মৃতি বুকে নিয়ে দীর্ঘ ২০ বছর ধরে সংগ্রামের সাথে জীবনযাপন করছেন একটি পরিবার। বলছি দেশের সর্ব দক্ষিণের সেন্টমার্টিনের সর্বশেষ তথা বাংলাদেশের শেষ ভূখন্ড ছেঁড়া দ্বীপে বসবাসরত একটি মাত্র পরিবারের সংগ্রামী জীবনযাপনের কথা।

সাদ্দাম হোসেন বয়স আনুমানিক ৪৭ বছর। দেখতে একজন সহজ সরল, দোহাড়া গড়নের ছিপছিপে শরীরের মানুষ। বসবাস করছেন ছেঁড়া দ্বীপের একটি জীর্ণ বাড়িতে। যা সেন্টমার্টিন থেকে প্রায় ৭ কি:মি দূরে একটি ফাঁকা উঁচু জায়গা। চারদিকে পানি আর পানি।

তাঁর সাথে থাকেন মা আর একমাত্র ছোট ভাই। দীর্ঘ ২০ বছর ধরে তিনি সেখানে বসবাস করছেন। কিন্তুু তা কিভাবে সম্ভব? চারদিকে কোন বাড়ি নেই, মানুষ নেই! যেদিকে তাকানো যায় শুধু অথৈই পানি আর উত্তাল সমুদ্রের ঢেউ। একা একটি মানুষ কীভাবে থাকেন এখানে, তাঁর জীবিকা কী, লবনাক্ত সাগরের পাশে বিশুদ্ধ পানি কোথা থেকে পান, অসুস্থ হলে চিকিৎসা সেবা কীভাবে নেন, নিসঙ্গ দ্বীপে ভয়-ভীতি কাজ করে কী না! বর্ষাকালে চারদিকে ভরপুর পানিতে ভাসতে থাকা দ্বীপে কীভাবে টিকে থাকেন, ভাটা শেষে জোয়ার আসলে কীভাবে যাতায়াত করেন! কৌতূহলী মনের তাড়না থেকে তাঁর কাছে জানতে চাই।

সাদ্দাম হোসেন মুচকী হেসে, দীর্ঘ ২০ বছর ধরে মৃত বাবা মো: হোসেন আলীর রেখে যাওয়া কয়েকটি গাছ, দু-চার টা হাঁস ও মুরগীর বাচ্চা আর জীর্ণ ঘরটিকে আগলে আছেন তিনি। তাঁর মা ও ছোট ভাই সাথে থাকেন।

এখনো বিয়ে করেন নি। সাদ্দাম হোসেনের প্রতিদিনের জীবন শুরু হয় সকাল বেলা কাঁধে করে দুই বালতি বিশুদ্ধ পানি সেন্টমার্টিন থেকে হেঁটে আনার মধ্য দিয়ে। সেন্টমার্টিন থেকে ছেঁড়া দ্বীপে আসতে সাহায্য নিতে হয় ট্রলার নয়তো স্পীড বোডের।

তবে সেন্টমার্টিন থেকে বাই সাইকেল ভাড়া করেও আসা যায় দ্বীপে। স্বাভাবিক গতিতে সময় লাগে ৫০-৫৫ মিনিট। তবে বালুময় প্রবাল দিয়ে সাইকেল চালানোটা খুব দুস্কর ব্যাপার। একেবারে দক্ষ চালকবিহীন সাইকেল চালানো অসম্ভব বৈকি! বলছিলাম সাদ্দাম হোসেন সকাল বেলা দুই বালতি বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের মধ্য দিয়ে দিন শুরু করেন। এরপরেই জীবনের তাগিতে, দু মুঠো অন্ন জোটাতে নেমে পড়েন সংগ্রামে।

দুই কি:মি দূরে বাগান থেকে নারকেল সংগ্রহ করেন। কাঁধে করে ২৫-৩০ টা নারকেল হেঁটে নিয়ে আসেন ছোট ছাউনির খোপরীতে। হাফ ছেড়ে নিশ্বাস ছেড়ে বসেন ছাউনির পাশে।

অপেক্ষা করতে থাকেন ছেঁড়া দ্বীপে বেড়াতে আসা ভ্রমণ পিপাসুদের জন্য। পাখির চোখে তাকিয়ে থাকেন দূর সমুদ্রের ঢেউয়ে। ট্রলারে বা স্পীড বোডে কখন আসবেন ভ্রমণ পিপাসুরা। ছেঁড়া দ্বীপ ঘুরে ক্লান্ত দর্শণার্থীরা বিশ্রামের জায়গা পান সাদ্দাম হোসেনের ছাউনিতে। সেখানে ডাবের ঠান্ডা পানিতে এক চুমুকে প্রাণ ফিরে পান তারা।

চাইলে দুপুরের খাবারও খেতে পারেন দর্শণার্থীরা। সন্ধ্যা নেমে রাত হলে কোনো ভ্রমণ পিপাসুর নিরাপদ আশ্রয়স্থল হতে পারে সাদ্দামের ছাউনি। সেক্ষেত্রে পোস্ট গার্ড তথা আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর অনুমতি নিতে হয় সাদ্দামকে। চারদিকে পানির সীমাহীন প্রবাহ, উত্তাল ঢেউ ও নীল আকাশ এবং দৃষ্টিনন্দন প্রকৃতি সত্যি ভাবুক করে তোলে দর্শণার্থীদের। সাদ্দাম হোসেনের কাছে জানতে চাই সংগ্রামী জীবনের আদ্যোপান্ত।

জবাবে সাদ্দাম হোসেনের মুখের কোণে এক চিলতি হাসি। সত্যি কঠোর পরিশ্রম ও প্রতিনিয়ত জীবনের সাথে যুদ্ধ করে হেসে বাঁচা যায় সেটা দেখতে হলেও ছেঁড়া দ্বীপে সাদ্দাম হোসেনের ছাউনিতে যাওয়া চাই। সাদ্দাম হোসেনের কপাল দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। মাত্র বাগান থেকে নারকেল নিয়ে এসেছেন। তার কাছে চাই আপনার জীবিকা কি? জবাবে সাদ্দাম বলেন, আমার জীবিকা আপনারই। শোনে অবাক কান্ড।

কীভাবে! তিনি বলেন, এই যে আপনাদের মতো হাজারো প্রকৃতিপ্রেমী প্রতিদিন এখানে আসেন। তারা পিপাসা মেটানোর জন্য নারকেল কিনেন, দুপুরে লাঞ্চ করেন, রাতে বারবি-কিউ পার্টি করেন।

এসবই তার জীবিকার অন্যতম উৎস। সারা বছরের মধ্যে ট্যুরের ৪ মাস ভরা মৌসুমে আয় রোজগার করেন আর বাকি ৮ মাস বসে থাকতে হয় তাকে। সেখানে কৃষি কাজ বা অন্য কোনো কাজের সুযোগ নেই সাদ্দাম হোসেনের।

এভাবে দিনের পর দিন জীবনের তাগিতে ছুটে চলেন সাদ্দাম। ছেঁড়া দ্বীপের চারদিক জোয়ারের সময়ে পানিতে টইটম্বুর হয়ে যায়। তখন কোনো দর্শণার্থী বিপদে পড়ে গেলে নৌকা বা ট্রলারে নিরাপদ জায়গায় পৌছে দেন তিনি। বর্ষার মৌসুমে পুরো ছেঁড়া দ্বীপ যখন পানিতে ভাসতে থাকে।

তখন উপরওয়ালার উপর ভরসা রেখে সাদ্দাম হোসেন ছোট পরিবার নিয়ে জীর্ণ ঘরে নিরিবিলি আশ্রয় নেন। বাংলা ভাষায় সব অঞ্চলের মানুষের সাথে কথা বলতে নাকি সাদ্দামের খুব ভাল লাগে! আঞ্চলিক ভাষা বেশ অপ্রিয় তার কাছে।

একা পথ চলতে কখনও নিসঙ্গ মনে হয় কি; না এমন প্রশ্নে সাদ্দাম বলেন, আমি একা নই। চারদিকে পানি, প্রবাল, নীল আকাশ, নারকেল বাগান এসবই আমার সঙ্গী। সবসময় তাদের সাথে আমার বেড়ে উঠা, সুখ দু:খ ভাগাভাগি করা। এভাবেই কেটে যায় দিন, মাস, বছর।

সত্যি আমাকে খুব ভাল লাগে এখানে। সরল স্বীকারোক্তি সাদ্দাম হোসেনের। দেশের সর্বশেষ ভূখন্ডে প্রত্যেক ভ্রমণ পিপাসুর কাছে আমন্ত্রণ সাদ্দামের। আসুন! বাংলাদেশকে দেখুন! প্রকৃতিকে উপভোগ করুন। প্রকৃৃতি তার আপন হাতে সাঁজিয়েছে সেন্টমার্টিনের ছেঁড়া দ্বীপকে।

লেখক: শাহিনুর রহমান শাহিন, জার্নালিজম এন্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

print