আমিও ফুল দিব! 

আমিও ফুল দিব! 

99
0
SHARE
লেখক,মোঃ আরিফ :
সবুজ:- বাবা, ও বাবা, আমাকে একটা গোলাপ এনে দাও না বাবা!
বাবা:-গোলাপ দিয়ে তুই কি করবি?
সবুজ:- ওই যে মাহমুদ, রহিম আর রায়হান কিনে এনেছে। কালকে ওরা নাকি শহীদ মিনারে ফুল দিবে। আমাকেও একটা গোলাপ এনে দাও না বাবা!
বাবা:- যা ব্যাটা ভাগ, নুন আনতে পান্তা ফুরায়,  আর তুই এসেছিস ফুল কিনে মিনারে দিতে। যা, গিয়ে দ্যাগ গে, শিমুল গাছে লাল লাল শিমুল ফুল ফুটেছে। ওটা নিয়ে দে।
ফোঁপাতে ফোঁপাতে সবুজ বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। গায়ের গেঞ্জিটা টেনে চোখ মুছে। সবুজ এখনো জানে না শহীদ মিনারে কেনো ফুল দেওয়া হয়। সে হাঁটছে। আনমনে হাঁটতে হাঁটতে পাড়ার সেহান ভাইয়ের কাছে যায়। সোহান ভাই ক্লাস সিক্সে পড়ে। সে এখন মাহমুদ আর রহিমদের লিডার।  খেলতে, পড়তে বা ঘুরতে গেলেই সোহান ভাই থাকে।
সবুজ:- সোহান ভাই, আমাকে একটা গোলাপ ফুল দাও না সোহান ভাই!
সোহান:- তুই ফুল দিয়ে কি করবি? এতটুকু পুঁচকে ছোড়া,  মেয়েদের ফুল দেওয়ার সখ হয়েছে নাকি?
সবুজ:- কালকে শহীদ মিনারে দিবো। ওই যে রায়হান ভাই ফুল কিনে এনেছে।  রহিম ভাই আর মাহমুদ ভাইও কিনেছে। কালকে ওরা ফুল দিবে।
সোহান:- শহীদ মিনারে ফুল কেন দেওয়া হয় তুই জানিস?
সবুজ:- নাতো ভাইয়া।
সোহান:- তাহলে শোন।
সেদিন ছিলো ইংরাজি ১৯৫২ সালের ২১ই ফেব্রুয়ারি। গাছে গাছে তখন নতুন পাতায় সবুজ হয়ে উঠেছে। পাখিরা নতুন বসন্তের আগমনে আনন্দে আত্মহারা। ফুল বাগানে ভ্রমর আর প্রজাপতির উড়াউড়ি ছিলো।
বাংলাদেশের মানুষ মনের আনন্দে গান গাইতো, নিজের মত কথা বলতো, নিজের মত হাসতে, কাঁদতো। কিন্তু আমাদের এই বাংলা ভাষাটা পশ্চিম পাকিস্তান মেনে নেয় নাই।  যার ফলে ২১ই ফেব্রুয়ারি ছাত্র, কৃষক, জেলে, তাঁতি, চাকরিজীবী এমনকি সর্বসাধারণ ভাষার দাবীতে রাজপথে নামে। সবার এক কথা এক দাবী।  “রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই।”
সবুজ:- তখন কি হলো ভাইয়া? পাকিস্তানীরা কি আমাদের এই সুন্দর ভাষাটা মেনে নিছে?
সোহান:- না রে! সেদিন আর তারা আমাদের মায়ের ভাষাটা মেনে নিলো না। উল্টো আন্দোলনরত মিছিলে পাঠালো পুলিশ।  ওরা এসে নিক্ষেপ করলো টিয়ার সেল,  ক্যাদানে গ্যাস। এতে করে সবাই ছত্রভঙ্গ হয়। খানিক পরে সবাই আবার একত্র হয়। তখন দুপুর শুরু হয়েছে। রাস্তায় শিমুল ফুল ঝরে পড়েছে।  তাই একটু লাল দেখাচ্ছে।  এমন সময় আন্দোলনরত জনতার উপর আতঙ্কিত হামলা শুরু হয়। চারদিক থেকে আসে গুলিবর্ষণ।  বুকে, পেটে গুলি লেগে রাস্তার উপর পড়ে যায়,  রফিক, জব্বার, ছালাম, বরকত, অহিউল্লাহসহ আরো অনেকে।
সবুজ:- ইস! কি ভয়ংকর।  তারপর কি হলো?
সোহান:- রাজপথে  তখন নেমে আসে রক্তের ঢল। শিমুল ফুলগুলোর লাল আর রক্তের লালে মিশে রাজপথ গাঢ় লাল হয়ে যায়।  আহাজারি কান্নায় ভেঙে পড়ে এই বাংলার মানুষ। এই শহীদের রক্তের বিনিময়ে, প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত হয় এই মহান ভাষা। তাইতো ২১ই ফেব্রুয়ারি দিনটাকে স্মরনীয় করে রাখার জন্য শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে আমরা শহীদদের শ্রদ্ধা জানাই।
সবুজ:- তাহলে আমাকেও একটা গোলাপ কিনে দাও না ভাইয়া! আমিও শহীদ মিনারে দিবো। আর শহীদদের বলবো, তোমরা বেঁচে রবে প্রতিটি হৃদয়ে।
সোহান:- দিবো রে পাগলা। এখন যা। সকালে একসাথে ফুল দিতে যাবো।
সবুজ মনের খুশিতে বাড়ি ফিরে। কালকে সেও সোহান ভাইদের সাথে ফুল দিতে যাবে। সবুজের মনে আর খুশি ধরে না। সেও গান ধরে, আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারি…..
সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখে হাতের কাছে অনেকগুলো ফুল। চিৎকার দিয়ে বাবাকে ডাকে।
সবুজ:- বাবা, ও বাবা। এতগুলো ফুল কে এনেছে?
বাবা:- কেনো রে পাগলা? পছন্দ হয়নি নাকি?
সবুজ:- অনেক পছন্দ হয়েছে। কিন্তু কে এনেছে? বলো না বাবা!
বাবা:- শহীদদের ভালোবেসে কি একটা ফুল দিবি? অনেক ফুল এনেছি রে৷ সব ফুল দিবি। আর শহীদদের বলবি, আমাদের ঘরে অভাব থাকতে পারে।  ভালোবাসার অভাব নাই৷
print