মঙ্গলবার   ১৬ আগস্ট ২০২২   শ্রাবণ ৩১ ১৪২৯   ১৭ মুহররম ১৪৪৪

লালমনিরহাট শ্বশুরবাড়ি থেকে বিদায় নিলেন জার্মান জামাই

প্রকাশিত : ১২:১২ পিএম, ১৫ মে ২০২২ রোববার

লালমনিরহাটে ছুটে এসেছেন জার্মান-বাংলাদেশী এক দম্পতি ড.প্যাট্রিক মুলার-মৌসুমি আক্তার ইভা। ঈদের আনন্দে মাতিয়ে তুলছেন সুদূর জার্মানি থেকে লালমনিরহাটে ছুটে এসেছেন জার্মান নাগরিক ড.প্যাট্রিক মুলার ও বাংলাদেশীদের লালমনিরহাটের মেয়ে মৌসুমি আক্তার ইভা।

আগামীকাল রোববার (১৫ মে) সকাল ৬টা ওই দম্পতি জার্মানের দিকে রওনা করবেন বলে জাগো নিউজকে নিশ্চিত করেছেন মৌসুমি আক্তার ইভা বাবা আখতার হোসেন।

প্যাট্রিক ও ইভা প্রথমবার শ্বশুরবাড়িতে ঈদ উদযাপন করতে পেরে দারুণ খুশী ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তুমুল জনপ্রিয় এই দম্পতি। শুধু তাই নয়, ধান মাড়াই,লুঙ্গি-গামছা পড়ে পুকুরে জাল দিয়ে মাছ,গ্রামের রাস্তা চলাসহ বিভিন্ন কাজ করছেন তিনি। এছাড়াও বাঙালি খাবার গুলো খেয়েছেন হাত দিয়ে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জার্মানি নাগরিক ড.প্যাট্রিক মুলার ও বাংলাদেশের মৌসুমি আক্তার ইভার দাম্পত্য জীবনের শুরুটা সিনেমার গল্পের মতই। ২০১৬ সালে উচ্চ শিক্ষার জন্য জার্মানিতে যান ইভা। সেখানে গিয়ে পড়াশুনার পাশাপাশি একটি রেস্টুরেন্টে চাকরি নেন। ওই সময় রেস্টুরেন্টে আসা যাওয়া ছিল অর্থনীতিতে পিএইচডি করা ড.প্যাট্রিক মুলার নামে জার্মানির নাগরিকের। এক পর্যায়ে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। এভাবেই ভালোলাগাটা আস্তে আস্তে ভালোবাসাতে রূপ নেয়। ছয় মাস প্রেমের পর ইভার পরিবারকে না জানিয়ে বিয়ে করেন জার্মান-বাংলাদেশী দম্পতি প্যাট্রিক-ইভা। বিয়ের এক বছরের মাথায় তাদের কোলজুড়ে আসে ফুটফুটে পুত্রসন্তান নাম রাখেন ইউহান।

প্যাট্রিক বর্তমানে বার্লিনে একটি বেসরকারি কোম্পানিতে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত আছেন।‌ দীর্ঘ চার বছরের সংসার জীবনে অসংখ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাংলাদেশের রুপ দেখে মুগ্ধ হয় জার্মানি জামাই। ইভার পরিবারকে নিয়ে ঈদ করতে চান প্যাট্রিক। তাই বাড়িতে জানালেন তার স্বামী ড. প্যাট্রিক মুলার ও তার ছেলে সন্তানসহ দেশে আসছেন।

গত ২৯ এপ্রিল জার্মানি জামাই শ্বশুর বাড়ি লালমনিরহাটে বেড়াতে আসেন। ধুমধাম করে বরণ করেন লালমনিরহাট শহরের স্টেডিয়াম পাড়া এলাকার মানুষরা। শ্বশুর বাড়িতে প্রথম এসেছেন জার্মানি জামাই। তাই সব ধরনের চাইনিজ খাবার রান্না করেছেন শ্বশুরবাড়ির লোকজন। ‌ কিন্তু জার্মানি জামাইয়ের আবদার বাঙালি খাবারের স্বাদ গ্রহণ করবেন। বিভিন্ন ধরনের মাছ-মাংসসহ নানা খাদ্যের সমাহার টেবিলে দেন। হাত দিয়ে বাঙালির মত খাবার খেয়েয়েছেন। এসব দেখে ইভার পরিবার আশ্চর্য হোন।

শুধু তাই নয়, গ্রাম ঘুরে দেখতে ঈদের পরের দিন লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলা পলাশী ইউনিয়নের একটি গ্রামে যান। গ্রামীণ পরিবেশের গ্রামীণ মানুষদের সাথে ধান কাটা, ধান মাড়াই, পুকুরে জাল ফেলে মাছ ধরা, গ্রামীন আঁকা-বাঁকা পথে বাই সাইকেল চালানো কোনটার মজা বাদ দেননি জার্মান জামাই প্যাট্রিক মুলার।

স্ত্রী ইভাকে সাথে নিয়ে গ্রামীন দৃশ্যে বাংলা গানের শুটিং করতেও ভুলেননি। গ্রামে ঘুরতে গিয়ে খেয়েছেন পান ও চুন। প্যাট্রিকের সরলতায় গ্রামবাসী মুগ্ধ হন। 

শনিবার (১৪ মে) দুপুরে পরিবার নিয়ে সৈয়দপুর বিমান বন্দর থেকে ঢাকার উদ্যােশে রওনা করেন। প্রায় ১৫ দিনের শ্বশুরবাড়ি সফর শেষে বিদায় নেন ড. প্যাট্রিক মুলার। শ্বশুর বাড়ি থেকে বিদায় বেলার দৃশ্য ছিল আরও বেদনার। বাংলার মানুষের মায়া ত্যাগ করায় নিজে যেমন কেঁদেছেন, শ্বশুর বাড়ি ও এলাকার লোকজনকেও কাঁদিয়েছেন তিনি। মেয়ে জামাই আর নাতিকে বিদায় দিতে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন তার শ্বশুর-শ্বাশুরি। এছাড়াও এলাকা জুড়ে প্রশংসায় ভাসছেন বিদেশি জামাই ড. প্যাট্রিক মুলার। আগামীকাল রোববার (১৫ মে) সকাল ৬টা ওই দম্পতি জার্মানের দিকে রওনা করবেন।

মৌসুমি আক্তার ইভা বলেন, অর্থনীতিতে পিএইচডি করা ড. প্যাট্রিক মুলার খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী । এতে আমার কোনো সমস্যা নেই। যার যে ধর্ম সে হিসেবে পালন করেছি।‌ তাকে ভালো মানুষ হিসেবে আমি জীবনসঙ্গী হিসাবে বেঁছে নিয়েছি। তিনি আরও বলেন,বাঙালি রীতি মেনে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা এখন করা হয়নি। তবে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা এবার বাংলাদেশে এসেই করার কথা রয়েছে।

ড. প্যাট্রিক মুলার বলেন, বাংলাদেশের মানুষদের থেকে নৈতিকতা নিয়ে পঞ্চমুখী। পোশাকসহ নানান ধরনের খাবার তার মন কেরেছে।তিনি সবার কাছে পরিবারের জন্য দোয়া চাই। বাংলাদেশের বিভিন্ন গ্রামগঞ্জে ঘুরে কেমন লেগেছে এমন প্রশ্নের জবাবে প্যাট্রিক বলেন, ফেসবুক ইউটিউব এর কল্যাণে বাংলাদেশের গ্রামের রঙ দেখেছি। বাস্তবে এতো সুন্দর দেশ আর কোথাও নেই।

লালমনিরহাট শহরের স্টেডিয়াম পাড়ার ইভার বাবা আখতার হোসেন বলেন, দীঘদিন বিদেশে থাকার পর সন্তান যখন বাবা-মমায়ের কাছে ফিরে আসে এর চেয়ে বড় কিছু হতে পারে না। আর জার্মানি জামাই পরিবারকে রেখে আমাদের সাথে ঈদ করেছে এটিও অনেক বড় পাওয়া আমাদের জন্য। জার্মানির মানুষ হয়ে এত ভদ্র আচরণ করেছে সবার সাথে যা কিনা ভাবাই যায় না। আমার মেয়ে ও জামাইয়ের জন্য সবার কাছে দোয়া চাই।

লালমনিরহাট পৌর মেয়র রেজাউল করিম স্বপন বলেন, জার্মান নাগরিক লালমনিরহাটের জামাই হয়েছে এটা জেলার জন্য গর্বের কথা। ওই পরিবারের এক দাওয়াত অনুষ্ঠানে গিয়ে জার্মান নাগরিক ড.প্যাট্রিক মুলার-মৌসুমি আক্তার ইভা সাথে কথা বলেছি। জার্মান নাগরিক  ড.প্যাট্রিক মুলার লালমনিরহাটে আসতে পেলে অনেক খুশি হয়েছেন।